যেমন ছিলো নব্বই দশকের শৈশব

আমরা থাকতাম মফস্বলে, সাধারনত যা হয়, যে এলাকায় থাকা হয় সে এলাকার প্রায় সবাই একে অন্যজনের পরিচিত থাকে। এলাকার রিক্সা চালক রহিম মিয়া থেকে শুরু করে ঢাকায় চাকুরী করা শিমুল ভাইয়ের নামও এলাকার সবার মুখস্থ থাকে। খুব আন্তরিক সম্পর্ক সকলের সাথে। আমাদেরকে শাসন করার অধিকার ছিলো আমাদের এলাকার বড় ভাইদের, স্কুলের শিক্ষকদের, বন্ধুর বাবা বা মা’দের। আমাদেরকে শাসন করলে কখনোই আমাদের মা বাবা ছুটে যেতো না অভিযোগ নিয়ে। কারন তারা জানতেন সত্যিই আমাদের হয়ত কোন ভুল ছিলো বলেই অন্যরা আমাদের শাসন করেছেন।

আমরা সে সময়ের ছেলে পেলে, যে সময়ে ফেইসবুকের দাপটে আমাদের শৈশব হারিয়ে যায়নি। ঘরের কোনায় চোখ মুখ বুঝে আমাদের সময় কাটেনি। আমাদের ঘুম ভাংতো সেই ভোর বেলায় পাখির কিচির মিচির আর মোরগের কুক্কুরু কু শব্দে। এরপর একটুখানি পড়তে বসা, মায়ের হাতের গরম গরম খাবার, স্কুলের জন্য তৈরি হওয়া, মাথার মধ্যে সারাক্ষন ঘুরতে থাকা স্কুলে গেলে আজকে ঐ খেলা আছে, বন্ধুদের সাথে দুষ্টামি, বাঁদরামি আর স্কুল শেষে দৌড়াতে হবে মাঠে। সাইকেল ভাড়া করে বন্ধুরা মিলে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। এভাবেই কেটে যেতো এক একটা দিন।

আমাদের প্রিয় যাদুর বাক্স ছিল ১৪ ইঞ্চি টেলিভিশন। আর টেলিভিশন মানেই বাংলাদেশ টেলিভিশন – ০ নম্বর চ্যানেল। সন্ধ্যার মধ্যে পড়া শেষ করে টিভির সামনে বুঁদ হয়ে বসে পড়া। আমাদের স্বপ্ন ছিল ম্যাকগাইভারের মত বুদ্ধিমান হওয়া। সেই ভুতের ঠেলায় এক একজন তখন পাল্লা দিয়ে এডভেঞ্চার করতাম ঘরের সব যন্ত্রপাতির বারোটা বাজিয়ে। মা বাবার বকুনি, উত্তম মাধ্যম খাওয়া ছিলো নিত্য নৈমিত্যিক ঘটনা।

আমরা গল্প করতাম হারকিউলিসের শক্তি নিয়ে, রবিন হুডের মহানুভবতা নিয়ে, আলাদিনের মজার দৈত্য নিয়ে, আলিফ লায়লার হাজার গল্পের আজগুবি চরিত্রগুলোকে নিজের মধ্যে কল্পনা করে। ভীষণ ভীতুও ছিলাম আমরা। ভয় পেতাম এক্স-ফাইলস দেখে। মনে পরে একটা পর্ব দেখে টয়লেটে যেতে ভয় পেতাম, কখন জানি টয়লেট দিয়ে এক্স ফাইলসের ভয়ংকর জন্তুটা বের হয়ে আসে। খুব মনে পরে শৈশবের মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড এর কথা। এক একটা সিরিয়াল নেশার মত মনে হতো। কত বকুনি পাশ কাটিয়ে এমন কি পরীক্ষার সময়েও মিস করতাম না একটা পর্বও। আসলেই, কি যে ছিলো বাংলাদেশ টেলিভিশন ৯০ এর দশকে? সকল শ্রেণীর দর্শকের মূল আকর্ষনের কেন্দ্র বিন্দু ছিলো প্রিয় এই জাদুর বাক্স।

আমাদের শৈশব এই ফেইসবুক নষ্ট করে দেয়নি। মোবাইল কি সেটা জানি এইচ এস সি পরীক্ষার পর বা তারো অনেক পর। আর এখন ৪-৫ বছরের ছেলে মেয়েরাই বুঁদ হয়ে থাকে ফেইসবুকে, ইন্টারনেটে, ভার্চুয়াল জগতে। আমাদের সময় কাটেনি ঘরের এক কোনে মোবাইলের ছোট্ট পর্দায় চোখ গুঁজে। নষ্ট হয়নি ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান খেলে, আমরা দৌড়াইনি ট্যাম্পল রানের ট্র্যাকে, আমরা ক্রিকেট খেলিনি টাচ স্ক্রিনের নড়া চড়ায়, বরং কাদামাটি গায়ে মেখে দৌড় ঝাপ করে দাপিয়ে বেড়িয়েছি পুরো শৈশব।

আমরাই হয়ত শেষ প্রজন্ম যাদের মা বাবারা ফেইসবুক ব্যবহার করেনি বা করছে না। আমরা বন্ধুদেরকে বলে দিতাম বিকালে ঠিক ৪টায় মাঠে থাকবো আর এর মানে হলো যত যাই হউক আমাদেরকে ঠিক ৪টায় মাঠে থাকতে হবে। আমরা সময় ধরে চলতাম। আমরা মোবাইল ফোনে খুঁজে নেইনি আমাদের লোকেশন। আমরা আমাদের অবস্থান নিয়ে কখনোই মিথ্যে বলিনি। আমরা প্রেম করতাম চিঠি লিখে, সে কি আবেগ সে কি অনুভূতি যা হাজার হাজার ঘন্টা ঐ ছোট্ট স্ক্রিনে আঙ্গুলের স্পর্শে লিখেও অনুভব করা যাবে না। আমরা ভিডিও চ্যাট করিনি সময় মেনে বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে সম্মুখ দর্শন করতাম। আমরা কখনো বন্ধুত্বকে সোশ্যাল মিডিয়াতে সীমাবদ্ধ করে ফেলিনি। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা আমাদের গল্পগুলো অন্য রকম হতে দেয়নি, কাটিয়েছি শেষ বারের মত করে বইয়ে লেখা ছেলে বেলার মত করে।

হুম জানি এসবের জন্য হয়ত অনেক কিছুই দায়ী। সে তর্কে যাবো না। আমি শুধু আমাদের শৈশব নিয়েই জানালাম কি সুন্দর ছিলো এক একটা দিন। কি উপভোগ্য ছিলো আমাদের ছেলে বেলা। সত্যি এই সময়ের ভার্চুয়াল কিডরা কখনোই অনুভব করতে পারবে না আমাদের শৈশব। খুব মিস করছি সেই দিন গুলো। আর কোন দিন ফিরে আসবে না।

– তসৌ।

(Visited 1 times, 1 visits today)