বন্দী চৈত্র সংক্রান্তি

আজ চৈত্র সংক্রান্তি, বাংলা বছরের শেষ দিন। এই দিনটি আমাদের কাছে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে সারা বছরের সব হিসেব চুকিয়ে দেয়া হয়। যতো পুরাতন, জীর্ন আছে সব ঝেড়ে ফেলতে হয়।

এই দিনের শুরুটা হয় একেবারে প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে। খুব ভোর বেলা জাগতে হয়। বিভিন্ন পুরনো গাছের ডাল, কাঁটা গাছ, পাতা এবং বিশেষ করে বিছুটি গাছ যা পোড়ালে ভীষণ ধোঁয়া হয়, ইত্যাদি জড়ো করে তাতে আগুন দেয়া হয়। এর ব্যাখ্যা হলো ধোঁয়ায় মশা মাছি রোগ জীবানু টিকতে পারে না। যেহেতু বছরের শেষ দিন সেহেতু সকল রোগ, জরা, ব্যাধি দূর করার জন্যই এই প্রতীকী আয়োজন।

এরপর ৮ ধরনের তিতা শাক, পাতা বেটে তার সাথে কাঁচা হলুদ বাটা এই সব গায়ে মেখে স্নান করতে হয়। এর ব্যাখ্যা হলো তিতা সাধারনত শরীরের ত্বকের জন্য ভীষণ উপকারী আর কাঁচা হলুদতো অবশ্যই। এই সব দিয়ে স্নান করার মানে হলো শরীরের যতো রোগ ব্যাধি, ত্বকের সমস্যা ও মানসিক ভাবে যতো কালিমা আছে সব ধুয়ে সাফ করে ফেলা। মানে মূল ব্যাপার হলো বিষয়টা আংশিক শারীরিক আংশিক মানসিক।

সেই ছোট বেলা থেকেই আমাদের এই রীতি। বিশেষ করে বাংগালী হিন্দুদের এই দিনটি এমন করেই শুরু হয়। স্নান করে এসে শুদ্ধ হয়ে পুজো দিতে হয়, প্রার্থনা করতে হয়। তারপর প্রসাদ নিয়ে সকালের খাবার। চিড়া, মুড়ি, খই, খইয়ের গুঁড়ো, খইয়ের গুঁড়ো দিয়ে বানানো এক ধরনের খাবার লাবন, দই মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে আমরা সকালের খাবার শেষ করি।

তারপর হলো মূল কাজ। পাঁচন তৈরি, অনেক রকমের (বাজারে যতো সবজি পাওয়া যায়) সবজি দিয়ে লাবড়ার মতো একটা তরকারি করা হয়। আহা সে কি স্বাদ। জিভে জল চলে আসে। দুপুরের মেনুতে এই আইটেম একাই ১০০। সাথে হয় ডালের বরা, কাঁচা আমের চাটনি আর চিকন চালের ভাত।

আমাদের আরেকটি রীতি হলো এই দিন থেকেই মূলত আমরা আম খাওয়া শুরু করি এর আগে না। একই রকম ভাবে অন্য একটা রীতি আছে তা হলো সরস্বতী পুজোর আগে বড়ই বা কুল খাওয়ার নিয়ম নেই আমাদের। যদিও এটি আমাদের ধর্মীয় কোন রীতি না এটি একেবারেই ঐতিহ্য বৈ কিছু নয়।

আর এই ভাবেই আমাদের একটি বাংলা বর্ষ বিদায় দেয়ার রীতি যা সময়ের স্রোতে এসে বা নানা ধরনের প্রতিকূলতা যেমন এবছর করোনা’র কারনে এই আয়োজন হয়ে উঠলো না। তবে বাবা মায়ের কাছে থাকলে কোন না কোন ভাবে এই আয়োজন হতোই।

খুব মিস করছি আজ খুব। আজ এই দিনটা এমন পানসে ভাবে কাটাচ্ছি খুব হতাশ লাগছে। মায়ের হাতের পাঁচন, চাটনি, সকালের দই, চিড়া, খই খুব মিস করছি। জীবন বড্ড কঠিন। এতো যান্ত্রিক আর প্রফেশনাল মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগে।

(Visited 1 times, 1 visits today)