নর্থ সিক্কিমে আপনি না জেনেই বিপদে পরতে পারেন

গত ৫ জুন থেকে প্রায় ৫-৬ দিন ছিলাম পারিবারিক সফরে সিক্কিমের গ্যাংটক ও নর্থ সিক্কিমের লাচুং ও লাচেন। গ্যাংটকে হোটেল থেকে নর্থ সিক্কিমের প্যাকেজ বুকিং করে খেয়েছিলাম ধরা তা আরেকদিনের গল্পে জানাবো। তো বুকিং করা প্যাকেজ অনুযায়ী দুপুর ১২টায় রওনা দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম উত্তর সিক্কিমের শিংরিং, লাচুং। ট্যুর অপারেটরের নির্ধারিত হোটেল রিগ্যালে। আমি আমার স্ত্রী ও ৫ বছরের মেয়ে সাথে আরো ৩ জন্য বাংলাদেশী ছাত্র ও ২ বড় ভাই। বাকিদের সাথে উত্তরে যাত্রার শুরুতেই পরিচয় হয় আমাদের।
হোটেলে পৌঁছানোর পর আমাদের জন্য নির্ধারিত ৩টি রুম (৩+৩+২) দেয়ার কথা, কিন্তু আমরা পাই মূলত ২টি ডবল বেডের রূম আর ১টি ট্রিপল বেডের রূম। এরপর আমরা অভিযোগ জানাই যে আমার মেয়ের জন্যও আলাদা করে আমরা একজনের সমপরিমান অর্থ দিয়ে প্যাকেজ বুক করেছি (যা মূলত উচিৎ করে নি প্যাকেজ বুক করার সময় সেই হোটেল, বাচ্চাদের মূলত হাফ দাম হয়, অন্য গল্পে বলবো) তাহলে ডবল বেডের রূমে আমরা কি করে থাকবো ৩ জন?? এবার শুরু হলো তাদের বিভিন্ন অযুহাত দেখানো, রূম নাই, বাচ্চাকে ম্যানেজ করেই থাকতে হবে, এভাবে তো আপনার হোটেলের লোক জানায় নাই, এখানে এভাবে সম্ভব নয় ইত্যাদি ইত্যাদি।। আমাদের সাথের যারা ছিলেন তারা সহ আমরা সবাই যখন একসাথে শক্তভাবে তাদের প্রতিবাদ জানালাম এরপর তারা বাধ্য হয়ে আমাদের জন্য ট্রিপল বেডের রূম দিলো।
রূমে ঢুকে দেখি রূমে না আছে তোয়ালে, না আছে সাবান, টিস্যু, টয়লেটের হ্যান্ড শাওয়ার। মানে একটা যাচ্ছে তাই অবস্থা৷ যদিও হোটেলের লোকেশন ও হোটেলের ইন্টেরিয়র ভালো ছিলো, পরিচ্ছন্ন ও ছিলো বেশ৷ কিন্তু সমস্যা হলো মূলত হোটেলের রাঁধুনি কাম বয় ও কেয়ার টেকার এই দুইজনই ছিলো বাংগালী কিন্তু মহা ধুরন্ধর।। তখনো বুঝতে পারিনি যে তারা ভেতরে ভেতরে এমন ফন্দি আঁটছে আমাদের ট্যাপে ফালানোর।
যথারীতি আমরা জিরো পয়েন্ট, ইয়াম্থাম ভ্যালি, ভ্রমণ শেষ করে এসে দুপুরের খবার খেয়ে যখন চেক আউট করতে যাচ্ছি তখনই শুরু হলো আসল নাটক। ঐ যে রাঁধুনি কাম বয় ছেলেটা এসে অভিযোগ করলো আমাদের সাথে যে ছাত্র ৩ জন ছিলো তাদের রূমের পানির ট্যাপ নাকি ভাঙ্গা, তারা নাকি ভেঙ্গে ফেলেছে, ঐটা রিপেয়ার করা হয়েছে এখন রিপেয়ার ও ট্যাপ বাবদ ২৪০০ রুপী দিতে হবে।।
ট্যাপটা মূলত ছিলো সেলো টেপ দিয়ে মোড়ানো ও যখন ট্যাপ চালানো হলো সাথে সাথেই পানির প্রেশারে ট্যাপ খুলে চলে আসে এবং এটা সাথে সাথেই তারা হোটেলের এই বয়কে জানায় ভোর বেলায় যখন আমরা সবাই বের হই লাচেন যাবার উদ্দেশ্যে, কিন্তু তখন এই ছেলে কোন রা করলো না। এবং তারা আমাদের অনুপস্থিতিতেই নাকি আবার সেটা নতুন কিনে এনে রিপেয়ার ও করে ফেলেছে এখন ২৪০০ রুপী দিতে হবে এই বাবদ। আমাদের তো মাথায় হাত বলে কি? সবাই মিলে আবার এগিয়ে এলাম এবং শক্ত ভাবে চেপে ধরলাম আমাদের ট্যুর গাইডকে। কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই মানতে রাজি না, তাদের এক কথা টাকা দিতেই হবে। এর মাঝে কথা বললাম ফোনে হোটেলের মালিকের সাথে এবার তারা একটু সূর নরম করে ১২০০ দিতে হবে মানে ৫০% এ এসে ঠেকেছে। এবার ছুটে এলো কই থেকে এক মহিলা, সে নাকি এই হোটেল বিল্ডিং এর মালিক। সে আরো ১ ডিগ্রি বেশি উত্তেজিত, সে চিল্লা চিল্লি শুরু করলো ২৪০০ টাকাই দিতে হবে। নতুন কল নাকি আমরা ইচ্ছা করেই ভেংগেছি। অবস্থা বেগতিক, স্থানীয় দুই এক জনও এসে যোগ দিচ্ছিলো, পরে আমরা বুঝতে পারলাম এখানে ঝামেলা করে বিপদে পরতে হবে তাই ১০০০ টাকা দিয়ে আমরা গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম।।
আমরা যা বুঝতে পারলাম বা আমাদের ট্যুর গাইড ও ড্রাইভারের আলাপে যা বুঝতে পারলাম, এই হোটেল রিগ্যালে একই কাজ আরো অনেক বার হয়েছে, এরা ইচ্ছে করেই ট্র্যাপে ফেলে। এই বাড়তি টাকা আদায়টাই মূলত ধান্ধা এদের।
গ্যাংকটক ভ্রমনে যা অবশ্যই খেয়াল রাখবেনঃ
১। যে কথাই বলুন না কেনো যার সাথেই বলুন না কেনো খুব পরিস্কার ভাবে কথা বলবেন। দরকার হলে একজন ফোনে রেকর্ড করে নিবেন।
২। কখনই হোটেল থেকে সিক্কিমের কোন ট্যুর বুক করবেন না বরং খুঁজে খুঁজে ট্যুর অপারেটর থেকে বুক করবেন দামাদামী করে। অন্তত ১৫০০/২০০০ বাড়তি নেয় হোটেলগুলো।।
৩। প্যাকেজে কি কি আছে তা লিখিত নিবেন। কোন হোটেল, হোটেলে কি কি থাকবে, খাবার কি কি হবে, এগুলো অবশ্যই ডবল চেক করে নিবেন।
৪। হোটেলে রূম পাবার পর অবশ্যই চেক করে নিবেন হোটেলের লোকের সামনে যে সব ঠিক আছে কিনা যাতে পরে অভিযোগ বা ট্র্যাপে ফেলতে না পারে।
৫। আমাদের কোন ট্র্যাভেল ভ্লগারই এই ধরনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তুলে ধরে না, বা তারা পেইড, স্পন্সরড বলেই বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যায়। তাই শুধু ভিডিও দেখে প্রস্তুতি নয় বরং যারা ভ্রমণ করে এসেছেন তাদের থেকে খুঁটিনাটি জেনে নিয়ে প্ল্যান করবেন।
৬। সিকিমিসরা কিন্তু বেশ ভালো, সিক্কিম পুলিশ ও বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি ভালো, তবে অতি অবশ্যই বাঙ্গালীদের এড়িয়ে চলবেন। এরাই মূল ঝামেলা গুলো করে।।
৭। পুরো সিক্কিমেই কিন্তু অন্য পাহাড়ি এলাকার তুলনায় সবকিছুর দাম কিছুটা বেশি পেয়েছি।

** এটি মাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এ ছাড়া কিন্তু আমাদের পুরো ট্যুর দারুন ছিলো। সিক্কিম ভ্রমণের দারুন অভিজ্ঞতার সাথে সাথে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে আমার, তাই আগে তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরবো এরপর বিস্তারিত ট্যুর নিয়ে লিখবো।

(Visited 4 times, 1 visits today)