গ্যাংটক ভ্রমণ পর্ব ২ – দেশের চেয়ে দেশের বাইরে কিন্তু ভ্রমণ খরচ কমঃ

গ্যাংটক ভ্রমণ পর্ব ২ – দেশের চেয়ে দেশের বাইরে কিন্তু ভ্রমণ খরচ কমঃ
অনেক দিন ধরেই চিন্তা করছিলাম কোথাও ঘুরতে যাবো, কোভিডের কারনে অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না।। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম, যে টাকা দিয়ে দেশের ভিতরে কোথাও ঘুরতে যাবো তার সাথে কিছু বাড়তি টাকা যোগ করে বরং দেশের বাইরে কোথাও ঘুরে আসি।। স্বাদ ও সাধ্য আর দেশের হাঁসফাঁস করা গরমের বিবেচনায় ঠিক করলাম ঠান্ডা আছে এমন কোথাও যাবো। খুঁজতে খুঁজতে সিদ্ধান্ত নিলাম গ্যাংটক যাবো। যেহেতু আগেই দার্জিলিং ঘুরে এসেছিলাম তাই তার পাশাপাশি অন্য একটা পাহাড়ি জনপদের কথা চিন্তায়, গ্যাংটকই এগিয়ে। আর এদিকে আগেরবার যখন গিয়েছিলাম অনুমতির অভাবে গ্যাংটক যাওয়া হয় নি তাই একটা আক্ষেপ ও ছিলো।

ভিসা চালু হবার পর মে মাসের মাঝামাঝি ভিসা করতে দিয়ে দিলাম, পোর্ট পছন্দ করলাম স্থলপথে চ্যাংড়াবান্দা, যেহেতু তখনো মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন চালু হয় নি। আবেদনের ৩ দিনের মাথায় আমাদের ৩ জনের ভিসাই পেয়ে গেলাম কোন সমস্যা ছাড়া। কোথাও যাবার আগে সাধারনত আমি যা করি, বিভিন্ন ভিডিও দেখি, লেখা পড়ি, অথেন্টিক সাইট থেকে সঠিক তথ্য নেয়ার চেষ্টা করি, হোটেল গুলোর রিভিউ দেখি, খাবার বা ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে পড়ি। সব মিলিয়ে একটা ড্রাফট চিত্র এঁকে নেই তারপর ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতি শুরু করি।

৪ জুন রাতে শ্যামলী এন আর পরিবহনের ঢাকা শিলিগুড়ি বাসে ৩টা টিকেট কেটে চড়ে বসি। কল্যানপুর থেকে রাত ৮ঃ৩০ এ ছেড়ে যায় বাস বুড়িমাড়ি সীমান্তের উদ্দেশ্যে। পথে রাত ১টা নাগাদ ফুড ভিলেজে যাত্রা বিরতি শেষে আবার চলতে শুরু করে বাস। দিলাম একটা ঘুম। এবার এক টানা বাস চলে ভোর ৫টায় আমাদের গাইডের ডাকে ঘুম ভাংগে। ট্র্যাভেল ট্যাক্স ও ইমিগ্রেশন সহায়তা বাবদ ৬৩০/- করে বুঝিয়ে দিলাম যা টিকেটের ২০০০/- এর বাইরে মানে আমার ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি যেতে লাগলো এখন পর্যন্ত ২৬৩০/ করে একেকজন। ৬টা নাগাদ বাস পৌঁছে যায় বাংলাদেশ লালমনিরহাট, বুড়িমাড়ি সীমান্তে। এদিকে প্রায় সারা রাত বৃষ্টি হচ্ছে সকালেও এর ব্যতিক্রম নাই। বাস থেকে নেমে যাবতীয় কাগজ (মূল পাসপোর্ট, পাসপোর্ট কপি, ভিসা কপি, ৩ ডোজ টিকার সনদ ও ছবি ২ সেট করে) জমা দিয়ে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করার জন্য গেলাম বুড়ির হোটেলে যদিও আমাদের ভ্লগাররা একটা হাইপ তুলে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী বুড়ির হোটেল কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, এখানে ভিন্নতা কিছুই নাই বা খাবার মান ও স্বাদ ও এমন কিছুই না আর ১০টা হোটেল যেমন একই বরং মনে হয়েছে এদের স্বাদ আরো খারাপ। কোন রকমে পরোটা, ভাজি, ডিম খেয়ে সকালের নাস্তা শেষ করলাম।

৯টায় ডাক পড়লো ইমিগ্রেশনের জন্য, ব্যাগ ও আমাদের একটা ভ্যান গাড়িতে করে স্থলবন্দরে পৌঁছে দিলো, অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পর ইমিগ্রেশন অফিসার আমাদের ডাকলেন। এন ও সি চাইলেন যেহেতু আমি ও আমার স্ত্রী চাকুরী করি। এন ও সি দিয়ে ছবি, তুলে (ফিংগার প্রিন্ট দিতে হয় নি) সিল মেরে পাসপোর্ট বুঝে নিলাম। এবার লাগেজ নিয়ে বিজিবি চেক পোস্টে আবার পাসপোর্ট দিয়ে তথ্য এন্ট্রি করে চললাম ভারতের সীমান্তের দিকে। বাংলাদেশ কাস্টমস পার হয়ে ঢুকলাম ঐ বর্ডারে, প্রথমেই বিএসএফ আমাদের পাসপোর্ট দেখলো, টিকার সনদ দেখলো তারপর চলে গেলাম ভারতীয় কাস্টমস এ। এখানে জানতে চাইলো টাকা আছে কিনা, রুপী নিলাম কি না, ডলার কতো আছে, দেখতে চাইলো ডলার। আমরা ৩ পাসপোর্টেই ডলার এন্ড্রোর্স করিয়েছিলাম অল্প কিছু আর বাংলা টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। শুধু আমার স্ত্রীর কাছে ডলার দেখতে চাইলো।

শ্যামলী এন আর এর কাউন্টারে গিয়ে এবার টাকাকে রুপী করে নিলাম, ডলার ভাঙ্গালাম। একটু আশে পাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম শ্যামলী কাউন্টারের ঐ লোকই সব থেকে ভালো রেট দিচ্ছে। ডলার ও টাকা ভাঙ্গানোর কারনে ঐ কাউন্টারের দাদা আমাকে একটা মোবাইল সিম দিলো আর বললো এটা যাবার সময় ফেরত দিলেই হবে। এবার এই কাউন্টারের লোক আমাদের থেকে ১০০ করে টাকা নিলো ভারতের দিকে ইমিগ্রেশনে সাহায্য করার জন্য। এখানে যা বুঝলাম আপনি শামলীকে ঐ বাড়তি টাকা না দিলেও চলবে যদি আপনি নিজে করেন তবে যাত্রীর চাপ থাকলে এদের হেল্প নিলে দ্রুত কাজ হয়ে যাবে। ১২টা নাগাদ কাজ শেষ করে ঐ সীমান্তের ছোট বাজার থেকে এবার কিছু প্যাকেট স্ন্যাক্স কিনে নিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম শামলীর ঐ পাড়ের গাড়ির জন্য। এখানে একটা সমস্যা প্রায় দেখা যায় চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি যাবার যে গাড়ি তাদের এটি প্রায় সময় খারাপ থাকে, তখন তারা ছোট ছোট কারে করে/ জিপে করে শিলিগুড়ি পৌঁছে দেয়। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিলো যা আমার ভালো লাগে নি। কারন এটি এক কথায় শর্ত ভংগ ব্যাতীত কিছুই না। এই পর্যন্ত আমাদের খরচ হলো বাংলাদেশী – ২৬৩০ + ইন্ডিয়ান ১০০/- (জনপ্রতি)

এখানে বলে রাখি আমি যেহেতু অনেক দিন বাদে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি আর সাথে আমার স্ত্রী ও মেয়ে তাই আমি এই ট্যুরটা রিলাক্স ট্যুর দিয়েছিলাম। আপনি চাইলে আমার পথ অনুসরণ না করে আরো স্বস্তায় ভ্রমণ করতে পারবেন। ঢাকা থেকে নন এসি বাসে বর্ডার, সেখানে থেকে ট্যাক্স জমা দিয়ে নিজেই ইমিগ্রেশন করে, অটো নিয়ে হাইওয়ে গিয়ে সেখান থেকে শিলিগুড়ির বাসে উঠতে পারেন।

যাই হোক প্রায় ৩টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম শিলিগুড়ি শ্যামলী বাস কাউন্টারে। পথে আমাদের বাসে পরিচয় হয় এক নব দম্পতির যারা যাচ্ছিলো হানিমুন করতে। তারাও গ্যাংটক যাবে তাই তাদের সাথে এক হয়ে একটা জিপ ভাড়া করে নিলাম। (এখানে অনেকেই বলেছেন গাড়ি ভাড়া করতে হয়ে এনজিপি স্ট্যান্ড থেকে, আবার এস এন টি থেকে আগেই অনুমতি নিতে হয়, আবার কেউ বলেছেন জিপ বুক করার সময় কথা বলে নিবেন যাতে তারা আপনাকে রংপোতে সাহায্য করে অনুমতি নিতে – এগুলো একদম সঠিক নয়।) এস এন টি থেকে অনুমতি নিয়ে কোন লাভ নাই আবার রংপোতে আপনাকে নামতেই হবে আর সেখানে গাড়ির ড্রাইভার আপনার কোন কাজে আসবে না, আপনার নিজেকেই পাসপোর্ট, ভিসা ও কোভিড সনদ দেখিয়ে অনুমতি নিতে হবে, রংপো তে চেক পোস্টে যারা আছে তারাই আপনার ফর্ম পূরণ করে দিবে। ফর্মে সিল দিয়ে দিলে তা যত্ন করে রাখবেন ও ৪/৫ কপি জেরক্স করে নিবেন। এবং চেষ্টা করবেন ফর্মে ফিরে যাবার তারিখ যা দিয়েছেন তার মাঝেই ফেরত আসতে না হয় আবার পুনঃঅনুমতি লাগবে এতে কালক্ষেপণ হবে। একটু সামনে এগিয়ে হাতের বামে নিচে নামতে হবে পাসপোর্টে এন্ট্রি সিল দেয়ার জন্য। এখান থেকেই আবার ফিরতি পথে এক্সিট সিল দিয়ে বের হতে হবে। মনে রাখবেন এই সিল/ সাইন ব্যতিত আপনি ভারতের ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাংলাদেশ আসতে পারবেন না।

আমরা মোট ৫ জনে ৫ হাজার টাকায় একটা সেভেন সিটার গাড়ি বুক করে যাত্রা শুরু করলাম। গতকাল সন্ধ্যা ৬ টায় বের হয়েছি বাসে উঠার জন্য, আজ এখন বাজে ৩টা এবং গ্যাংটক পৌঁছাতে বাজবে রাত ৮টা। মানে প্রায় ২৪ ঘন্টার এক বিরাট ভ্রমণে আছি আমরা। এই বিশাল ক্লান্তিময় ভ্রমনের শুরুতেই শালুগাড়া, সেভকের পথে কিছু দূর এগিয়ে চোখে পড়লো দু পাশে বড় বড় পাইন গাছের সারি আর বিশাল এলাকা জুড়ে বেঙ্গল সাফারি। রাস্তাটা এতো সুন্দর, মুহুর্তেই কেমন জানি মন ভালো হয়ে গেলো। খানিক আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে তাই পথ ও গাছেরা ভিজে সতেজ। হিমেল হাওয়া বইছে, গাড়িতে দারুন সব গান বাজছে। হুট করেই চোখের সামনে তিস্তা নদী, পাহাড়, মেঘ সব মিলিয়ে এমন অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য ভেসে উঠলো আমরা গাড়ী থেকে নামতে বাধ্য হলাম। আমরা মেঘের উপরে, নিচে তিস্তা নদী আর চার পাশে খালি পাহাড় আর পাহাড়।

এখন অব্দি খুব বেশি কিছু খাওয়া হয় নি, টুকটাক বিস্কুট, জুস, চিপস এগুলো ছাড়া। এদিকে পেটে কিচিরমিচির শুরু করলো, আমার মেয়ে জিপ/ কার টাইপ গাড়িগুলোতে খুব অস্বস্থি বোধ করে, সাফোকেশন হয় তার, সব মিলিয়ে একটা ব্রেক দেবার দরকার ছিলো, রংপোর কিছুটা আগে আমরা ব্রেক দিলাম একটা ধাবা টাইপ হোটেলে। নেমে নুডলস, ফ্রাইড রাইস, মোমো খেয়ে নিলাম – ২৫০/৩০০ টাকা বিল ছিলো। প্রায় ৬টা নাগাদ রংপোতে পৌঁছে ইনারলাইন পারমিট নিইয়ে ছুটে চললাম গ্যাংটকের দিকে, আর শুরু হলো বৃষ্টি আর মেঘের খেলা। যতোই এগোই মেঘের আড়ালে ঢুকে যাচ্ছিলাম। পথে ছোট ছোট অনেক গুলো ঝরনা পেলাম যা এই বর্ষাকালে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে আর ছুটে যায় তিস্তায়।

মেঘ বৃষ্টির মাঝেই রাত প্রায় ৮টায় পৌঁছে গেলাম আমাদের আগে থেকে বুক করা হোটেলে, আম্বা রিগেন্সি হোটেল, এটি ৩ তারকা মানের একটি হোটেল মোটামুটি ভালো দামে এটি বুক করেছিলাম বুকিং ডট কম থেকে। তবে আমার সজেশন হবে যদি পিক সিজন না হয় তবে হোটেল আগে থেকে বুক করার দরকার নেই, গ্যাংটকে পৌঁছে তারপর একটু এদিক ওদিক হেঁটে হোটেল বুক করতে পারেন। তবে আমাদের বেলায় হোটেল আগে থেকে বুক করায় আমাদে কিছু সুবিধা হয়েছে তা হলো বৃষ্টি ছিলো আর রাত ৮টার বেশি হওয়ায় আমার মেয়েকে এবং স্ত্রীকে কোথাও দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় নি। বা অপেক্ষা করতে হয় নি। আমরা এই হোটেলে নর্থ সিক্কিম যাবার আগ অব্দি ৪ রাত ৩ দিন ছিলাম, সকালের ৩ জনের নাস্তা কমপ্লিমেন্টারি ও ৩ বেডের রুম মিলিয়ে আমাদের বিল এসেছে ১৩৩০০/- এর মতো মানে ৩৩২৫/- প্রতি রাত। হোটেলটার লোকেশন, (এমজি মার্গের একদম কাছে, প্রায় ১০০টি সিড়ি ভেংগে উপরে উঠলেই এমজি মার্গ, যদিও একেবারে এমজি মার্গেও চাইলে হোটেল নিতে পারেন তবে তার ভাড়া বেশি পড়বে আর কম হলে হোটেলের মান ও কম হবে) নাস্তা, রুফটপ রেস্টুরেন্ট, রুমের ইন্টেরিয়র, রুমের সাইজ, ভিউ সব মিলিয়ে আমরা অনেক সন্তুষ্ট ছিলাম।

পরের দিন সকালে নাস্তা করে বের হয়ে একটা ছোট প্রাইভেট কার ভাড়া করি হাফ ডে গ্যাংটক সিটি ট্যুরের জন্য। ২০০০/- নিয়েছিলো, আরো মুলামুলি করলে ১৫০০/- দিয়ে নেয়া যেতো।

(Visited 2 times, 1 visits today)