গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠি, কিছুতেই আর ঘুম আসছিলো না, হুট করেই খেয়াল করলাম ঘর জুড়ে কি এক অদ্ভুত মায়াবী সুগন্ধি ছড়িয়ে আছে। ভাবলাম হয়ত ঘুমের ঘোরেই কিছু একটা দেখছি। ঘোর কাটাতে উঠে বসলাম। চোখ রগড়ে নিজেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না আমি জেগেই আছি তাই আর জাগাতে হয় নি নিজেকে। এবার উঠে পরলাম, বিছানার পাশে রাখা গ্লাস হাতে নিয়ে দেখি এক বিন্দু জল নেই তাতে। মনে পরলো রাতে কাল গুরুপাক খাওয়া হয়েছিলো তাই বড্ড পিপাসা পাচ্ছিলো বারে বারে। কোন ফাঁকে শূন্য করে ফেলেছি। তবুও উল্টে ধরে মিছেই তৃপ্তি মেটাই।
না ঘুম আর আসবে না, উঠে পরি। যাই দেখি কিছু একটা করে আবার ঘুম আনতে পারি কিনা। হঠাৎ মনে পরলো নিমাই ভট্টাচার্যের “মেম সাহেব” পড়ছিলাম ক’ পাতা বাকি আছে, শেষ করে ফেলি। বই পড়া তো অব্যার্থ চেষ্টা ঘুম আনার, ৮০ বা ৭৯ নম্বর পাতা উল্টাতে উল্টাতে সেই মায়াবী সুগন্ধের তীব্রতা বাড়তে লাগলো। ব্যাপারটা এমন, যেন ঐ সুগন্ধি আমন্ত্রণ করছে তার আরো কাছে ছুটে যেতে। কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না। বহু কষ্টে আরো দু পাতা শেষ করে, উঠে যেতে বাধ্য হলাম। মনে মনে ভাবলাম পড়া যখন হলো না কফি বানাবো, দু চুমুক দিয়ে তারপর বারান্দায় গিয়ে সুগন্ধির কারন খোঁজা যাবে।
কিচেনের দিকে যেতে হুমড়ি খেয়ে পরতে পরতে নিজেকে সামলে নিলাম, কেনি আঙ্গুলটা আটকে গেছে লণ্ড্রী বিনের সাথে। আবছায়ায় খেয়াল করতে পারিনি। অনেক দিন ওটা খুলে দেখা হয় না, ময়লা কাপড়ও রাখা হয় না। ওটা খুলে কখনো আমার ময়লা কাপড় রেখেছিলাম কিনা মনে করতে পারলাম না। বিনটা কিনেছিলাম নিউ মার্কেটের ভেতরে যেখান দিয়ে মানুষ হাঁটে আর হকার গুলো এটা ওটা বিকোয়। বিয়ের পরে প্রথম যখন ঢাকা আসি তল্পিতল্পা নিয়ে, তখন এমন খুঁটে খুঁটে অনেক কিছুই কিনেছি নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, গাউছিয়ার সামনে থেকে যা আমার বিচারে একাবারেই বেহুদা আর নীলার কাছে তা ভীষণ দরকারি। কতো কপট রাগ দেখিয়েছি আমি তখন। কি দরকার টাকা খরচ করার? কটা পয়সা বাঁচলে একদিন না হয় রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে পারবো। তার সাফ কথা অতো খাই খাই না আমার আগে সংসার চাই। মনে আছে আমি এটা নিয়ে একটা মজার শ্লোগান ও দিয়েছিলাম – “আর নয় খাই খাই আমার শুধু সংসার চাই”। নীলা হেঁসে খুন। আমি চুপচাপ আমার মানিব্যাগের লজ্জা ঢেকে ওর স্বপ্নগুলোকে জোড়াই দিতে চেয়েছি।
এতোক্ষনে সম্ভিত ফিরলো, পায়ের তলা ভেজা। হাতরে লাইট জ্বালাতেই দেখি যা হবার হয়ে গেছে, রক্তে মোটামুটি আঙ্গুলের স্নান হয়ে গেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে, কফির কাপে ঠোঁট ছোঁয়াই। শোবার ঘরের লাগোয়া দখিনের বারান্দার দরজা খুলে বের হয়ে এলাম। তীব্র গন্ধে নেশা ধরে গেলো এক মুহূর্তে। সন্ধায় এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখনো গাছের পাতা ভেজা। বর্ষার বৃষ্টি আমার ভালো লাগে তবে এই বৃষ্টি বড্ড বেশি আন-রোম্যান্টিক, সময়ে অসময়ে এসে পরে। হাল্কা বাতাসে বারান্দায় রাখা পাটের পেঁচাটা দুলছে। নীলা ওটার নাম দিয়েছে টুকুস, এটা ওর বন্ধু ছিলো। আমি অফিস চলে গেলেই বেছে বেছে আমার জামাগুলো জড়ো করা, যত্ন করে বিনে তা জমিয়ে রাখা। কাজ গুছিয়ে এসে এই বারান্দাটাই ছিলো তার সময় কাটানোর জায়গা সাথে ঐ টুকুস। কতো গল্প যে করতো আমি বাসায় এলে আবার আমাকে বলতো সব। আমি মজা করে টুকুসকে বলতাম তোর জন্য দুঃখ হয় রে আমার এই রমনীর বকবক শুনতে হয় সারাক্ষণ। নীলা রাগ দেখায় তবে তা মিথ্যে আমি বুঝতে পারি। এভাবেই মেয়ে গুলো সংসার সাজায়। ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ভালোবাসা দিয়ে বিশাল বিশাল গল্প, উপন্যাসে রূপ দিয়ে দেয়।
এক বর্ষায় ১০ কাঠার একটা জায়গা কিনেছিলাম, ঝুম বৃষ্টি ছিলো প্রথম যখন ঐ মালিক থেকে নিজেকে মালিকে রূপ দেই। পিঁপড়ের মতো দিনে দিনে স্বপ্নের সম্রাজ্য গড়েছি, আমার চেয়ে নীলারই বরং স্বপ্নের রাজ্য এটি। ঐতো সীমানা প্রাচীরের চার কোনায় একটু পর পর কামিনী ফুলের ১৭টা গাছ, গুনে গুনে ১২টা শিউলির গাছ, ১০ খানা বকুল, ৫ খানা কদম, হাসনাহেনা, ১০ খানা গন্ধরাজ ফুলের গাছ দিয়ে দিনে দিনে এক ভালোবাসার রাজ্য গড়ে তুলেছে মেয়েটা। এখন বর্ষা কালে আমি মাঝে মাঝে মোহগ্রস্থ হয়ে পরি। রাত বিরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, আমি মুগ্ধ হই, ঘুমিয়ে পরি, আবার জাগি। একটা সাইকেলে পরে আছি। কফির শেষ চুমুক দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম আকাশের চাঁদ এখন প্রায় পশ্চিমে। কদমের জ্যামিতিক সরল রেখার মতো কান্ড ভেদ করে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে উঠোনে। স্পষ্ট আমি দেখতে পাচ্ছি উঠোন জুড়ে বকুল ফুল অবহেলায় পরে আছে। হাত দিয়ে ছুঁতে ইচ্ছে করছে, চাঁদের আলো গায়ে মেখে স্নান করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আজ আমি কোথাও যাবো না। ভিজুক উঠোন, অবহেলায় পরে থাক সব ফুলেরা, সময় কেটে যাক, পাটের পেঁচা বাতাসে উড়ে উড়ে যাক
।
।(Visited 1 times, 1 visits today)