জয় হউক ক্রিকেটের

প্রথম আলোর এক সাংবাদিকের করা প্রশ্নের উত্তরে সাকিব আল হাসান বলেনঃ এখন একজন যে একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিচ্ছে, সেটা আমি মনে করি না। আগেও বলেছি, ক্রিকেটে তিন-চারজনের অবদান ছাড়া কেউ কখনো ম্যাচ জেতে না। কেউ যতই ভালো খেলুক, এমন তো নয় যে সে একাই ১০ উইকেট নিয়ে নিচ্ছে বা একাই তিন শ রান করছে। একজন ৮৫ করে, একজন ১০ করে, আরেকজন ৪০ করে। এক-দুইজন হয়তো অনেক ভালো করবে। কিন্তু আশপাশের ১৫ রান, ২০ রান, ১ উইকেট, একটা ভালো ক্যাচ ধরা—এগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যে ওই ১০ রান করেছে, সে তো অনেকটা সময় উইকেটে থেকে এই রানটা করেছে এবং তাঁর ওই অবদানও দলের জয়ের পেছনে কাজ করে। এই জিনিসগুলো হয়তো সবাই বুঝবে না। যারা খেলেছে, যাঁরা জানেন, তাঁরা বুঝবেন।

সাকিবের উপরের উত্তর সেই সকল বোদ্ধাদের এবং ভক্তদের জন্য পেশ করলাম যারা দল একটু খারাপ করলেই খেলোয়ারের নাম ধরে ধরে চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁদের ব্যাক্তিগত থেকে শুরু করে সংসার কোন কিছু নিয়ে বলতেই ছাড়েন না। ইচ্ছে মত গালি, অপমান দিতে ছাড়ে্ন না। তাঁদের কে বলি সাকিবের কথাটা খুব সত্যি এবং খুব কষ্টের – “এই জিনিসগুলো হয়তো সবাই বুঝবে না। যারা খেলেছে, যাঁরা জানেন, তাঁরা বুঝবেন।”

বেশি লাগেনা ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। আপনাকে নামিয়ে দেয়া হলো পাড়ার মাঠে খেলার জন্য, বলে দেয়া হলো ম্যাচ জিতেই তবে উঠতে হবে। না হলে পরের ম্যাচে অমুককে নেয়া হবে। ক্রিজের মাঝখানে গিয়ে তখন অনুভুতিটা কি হবে ভাবতে পারেন?

আর এইক্ষেত্রে এইটা পাড়ার মাঠ না, লক্ষ, কোটি মানুষ দেখছে ভালোবাসা, রাগ, ক্ষোভ আর গালি নিয়ে একটু ভুল হলে আপনাদের একের পর এক অপমান, গালি আর বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ এই সব ভয় মাথায় নিয়েই খেলতে হয় এদের। খেলতে হয় প্রতিপক্ষকে হারাতে, খেলতে হয় নিজের পারফরম্যান্স দেখাতে, দলে পাকা জায়গা করে নিতে। ভেবে দেখেছেন এদের এক এক জনের কতগুলো প্রতিপক্ষ?

আপনারা যারা এই খেলোয়াড় গুলোকে নিয়ে ট্রল বা রসিকতা করেন, যখন অপমান করেন, কথায় কথায় এদের ব্যাক্তিগত জীবনকে রাস্তায় নামিয়ে আনেন তাঁদেরকে বলি, এরা কিন্তু আপনার আমার ভাই, আপনার আমার ঘরের ছেলে।

আপনি নিশ্চয় আপনার ভাই বোন মা বাবাকে নিয়ে ট্রল করেন না? কথায় কথায়ও তাঁদের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে রসিকতা করেন না? আপনি অদ্ভুত এক সুখ পাচ্ছেন এক একজন খেলোয়ারের খারাপ পারফরম্যান্সের পর তারে নিয়ে অদ্ভুত রকমের মজা করে।

পরীক্ষার হলে যখন কম নম্বর পাইতেন বা আপনার পাশের বাসার বিল্টুর থেকে যখন খারাপ করতেন তখন বাবা মা যে বকা দিতো বা সহপাঠিরা যে মজা করতো সহ্য করতে আপনার কেমন লাগতো? হয় অনুভুত? এইবার বুঝেন এমনই লাগে যখন নাসিরের পানি টানার ট্রল করেন, নাসিরের বোনকে নিয়ে নোংরা রসিকতা করেন।

তামিমকে ডানো নিয়ে পচান, সাকিবরে এ্যারোগেন্ট, অহংকারী, বেয়াদব বলে গালি দেন, শুভাগত হোমকে নিয়ে মজা করেন, সৌম্য সরকারকে নিয়ে মজা করেন, এমনই দুর্ভাগা জাতি আমরা আজকে হয়ত ম্যাসকে হিরো, এই প্রযন্মের মুক্তিযোদ্ধা, সুপারম্যান, কত কি নামে ডাকছি।

লিখে রাখেন আমার কথা পর পর তিনটা ম্যাচ হারতে দেন বা সে একটু খারাপ পারফরম্যান্স করুক, এই আপনি আমিই তার গুষ্টি উদ্ধারে ব্যাস্ত হয়ে পরবো। ভুলে যাবো অতীত অবদান। আমরা আসলে দু মুখো সাপ। ক্রিম খাওয়া জাতি। খালি খেতেই জানি। আমরা খুব সহজে মানুষকে উপরে তুলি তারপর আবার সজোরে উপর থেকে ছুড়েও মারতে পারি।

এই ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে আসুন ভালবাসতে শিখুন। একটা বড় চাপ থেকে ওদেরকে বাচিয়ে দিন। আপনি আমি যদি তাদেরকে নিশ্চিত করতে পারি যে তোমাদের আমরা প্রচন্ড ভালোবাসি তোমরা শুধু খেলে যাও, খারাপ বা ভালো খেলা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমাদের ভালোবাসার কমতি কোনদিনই হবে না।

লিখে রাখেন এই নিশ্চয়তা যদি ওদের দিতে পারেন আজ হউক কাল হউক আমরাই বিশ্বসেরা হবো। ক্রিকেট ইতিহাসের রেকর্ডের খাতায় এখন প্রায় পাতায় পাতায় আমাদের স্থান। আর কটা দিন যেতে দিন পুরো রেকর্ড বই দখল করে ফেলবো। এই দলটা বাংলাদেশের সেরা দল, আমি বলব না কারন তাহলে ওদের থেমে যেতে হবে, আত্মতৃপ্তি চলে আসবে। আমি চাই সামনে যে দলটা আসবে সেটা এইটাকেও যেন ছাড়িয়ে যায় যুগ যুগ ধরে।

সব বাবা মা না হউক, কেউনা কেউ অন্তত বলতে শুরু করে দিয়েছে আমার ছেলে সাকিবের মত হবে বা তামিমের মত হবে। ওকে ক্রিকেটার বানাবো, ডাক্তার বা প্রকৌশলী নয়। খুব বেশীদিন বাকি নেই দেশে আরো অনেকগুলো বিকেএসপি লাগবে, ক্রিকেট প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় লাগবে। ঝাঁকে ঝাঁকে শিশু, কিশোর, তরুনরা আসছে সাকিব, তামিম, মুস্তাফিজ হয়ে উঠার জন্য। সেই তালিকার শুরু কিন্তু এই মুস্তাফিজ, মোসাদ্দেক আর মেহেদীরা।
জয় হউক ক্রিকেটের।

তপু সৌমেন
ঢাকা, বাংলাদেশ।

(Visited 1 times, 1 visits today)