ফাতেমা এক উচ্ছল তরুনী সবে মাত্র কৈশোর পেরিয়ে এসেছে। এখনো তার চোখে মুখের কৈশরের উচ্ছলতা মুছে যায়নি। মেঘনা পাড়ে বাড়ি তার, বাড়ি বলাও ভুল হবে আসলে ছোট্ট খুপরি ঘর। বাবা ইলিশ ধরার জেলে। সংসারে মা, বাবা, এক ভাই আর সে। ফাতেমা সংসারে বড়। রাশেদ ফাতেমার ছোট ভাই। সে একটা এনজিও স্কুলে পরে। ফাতেমাও ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর আর স্কুলে যাবার সাহস দেখায় নি। কারন সব থেকে বড় ভয় বখাটের উৎপাত। দেখতে সুন্দরী হওয়ায় স্বভাবতই তার প্রতি হায়নার দৃষ্টি সারাক্ষণই ভীত করে রাখে তাকে আর তার পরিবারকে। তাই আর পড়া হয়নি। খুব সাধারন ভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো একদিন ভাইয়ের স্কুলের একজন এনজিও কর্মকর্তা আসলো তাদের ঘরে গবেষনামূলক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে। ফাতেমার সাথে সুহাসের সেই প্রথম দেখা। সুহাস রাশেদের স্কুলের স্যার, অনেকটা প্রথম দেখায় সুহাস ফাতেমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর নানা বাহানায় সুহাস চোখের গোচরে রাখতে থাকে ফাতেমাকে। অজানা এক ভালো লাগা কাজ করতে থাকে সুহাসের। ফাতেমা তখনো ভালোবাসা কি বুঝে উঠতে পাড়ে নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত সুখানুভূতি কাজ করে যখন সুহাসের কাছাকাছি থাকে। দিন যায়, বিভিন্ন ভাবেই দুজনের কাছাকাছি আসার সুযোগ বাড়তে থাকে। সুহাস কথা বলতে চায় কিন্তু ফাতেমা কথা এগিয়ে নিতে দেয় না। চোখে চোখ পড়ে কিন্তু ফাতেমা গুটিয়ে নেয় নিজেকে। হয়ত মনে সংশয় বা আসলেই জানে না কি করে সুহাসের চাহুনির উত্তর দিতে হয়। ভীষন সরল এ প্রেম কাহিনী। হুট করেই একদিন সুহাস জানায় “ফাতেমা আমাকে ক দিনের জন্য একটু ঢাকা যেতে হবে আমার একটা ট্রেনিং আছে শেষ করেই ফিরবো।” ফাতেমার বুকে ধক করে উঠে, কেনো জানি ভীষন কান্নায় নিজেকে লুকিয়ে নেয়। ভেতরে ভেতরে এক শুন্যতা কাজ করতে থাকে। সুহাসও কষ্ট পাচ্ছিলো ছেড়ে যেতে, কোন রকমে নিজেকে সামলে চলে যায়।
দিন পাঁচেক পরের ঘটনা। সকাল থেকেই ফাতেমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না, তন্ন তন্ন করেও কোথাও ফাতেমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা পাগল প্রায়, মা বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। ভাই উদ্ভ্রান্তের মত এদিক ওদিক ছুটছে বোনের খোঁজ পাবার জন্য। কিন্তু অনেক খুঁজেও আর পাওয়া গেলো না ফাতেমাকে।
ফাতেমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে লক্ষীপূরের আলেকজান্ডার গ্রামের এক নারী পাচারকারী দল। যারা মূলত বিভিন্ন অসহায় মেয়েদের টার্গেট করে। বহু দিন ধরে তাদের নজরে রাখে, খোঁজ নিতে থাকে বিভিন্ন ভাবে। এরপর সুযোগ বুঝে তুলে নিয়ে যায় আর পাচার করে দেয় অন্য দলের কাছে। এক দুর্বিশহ বেদনা, লাঞ্ছনা আর শারীরিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে ফাতেমাকে পার করতে হয় প্রায় ১ সপ্তাহ একটি বন্ধ ঘরে। নর পিশাচের দল এই সাত দিনে ইচ্ছে মত নির্যাতন করে ফাতেমা কে। আর সাত দিন পর এই পাচারকারী দল পরের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে আসে তাকে।
সুহাসের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার কুটুম্ভপুর গ্রামে। শৈশব কেটেছে গ্রামেই, স্কুল ছিলো গ্রামে এরপর কলেজে ভর্তি হয় ফেনী সরকারী কলেজে এবং এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় বাংলা সাহিত্যে। ভীষণ স্বাধীনচেতা এক ছেলে। কবিতা তার ভীষণ প্রিয়, নিজেও ভালোবাসে কবিতা লিখতে। অসম্ভব ভালো মনের এবং সহযোগী মনোভাবের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই বন্ধুদের কাছে প্রশংসিত ছিলো সে। চাকুরী জীবন শুরু করে চর এলাকার ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করা একটি এনজিওতে। সেই অফিসেরই ১৫ দিনের ট্রেনিং এ সে এখন ঢাকায়। আজ শেষ দিন। ট্রেনিং এর এক পর্যায়ে তার ডাক পরলো অফিসের একজন উর্ধতন কর্তৃপক্ষের রুমে। সেখানে পৌঁছেই সে জানতে পেলো তার প্রমোশন হয়েছে, কর্তা বললেন “সুহাস অনেক তো চর এলাকার উন্নয়ন করলে, তুমি খুব পরিশ্রমী, তোমার পার্ফরমেন্স ও যথেষ্ঠ ভালো, তোমাকে এবার অন্য একটি প্রজেক্টের দায়িত্ব নিতে হবে। শহরের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করতে হবে। কালই তুমি হেড অফিসে জয়েন করে চলে যাবে নারায়ণগঞ্জ পতিতা পল্লীতে। সেখানে যৌন কর্মীদের বাচ্চাদের শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে হবে।” সুহাসের চোখে মুখে তখন তীব্র আলোর ঝিলিক, অসম্ভব খুশি মনে ভাবতে লাগলো এবার সাহস করে ফাতেমাকে নিজের মনের কথা বলা যাবে, বলা যাবে তাকে আপন করে নেবার কথা। জানানো যাবে আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। এইসব ভাবতে ভাবতেই সে রাজি হয়ে গেলো। জানতে পারলো আগামী কাল জয়েন করে কাজ বুঝে নিতে হবে, এরপর চাইলে সে দু একদিন ছুটি নিতে পারবে।
সুহাসের কাজের প্রথম দিন, সেখানে উপস্থিত ছিলো তার অফিসের একজন কলিগ, শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর সুহাস আর দেরি না করে নেমে পরতে চাইলো কাজে। শুরুতেই বিভিন্ন তথ্য জেনে নিতে থাকে। এরপর বিভিন্ন ফাঁক ফোঁকর গুলো বুঝে নিতে থাকে।
ফাতেমা জানেনা সে কোথায়, গত ১৪ দিনে সে শুধু কয়েক বারের জন্য চোখ খুলতে পেরেছে আর টুকটাক খাবার, পানি খেয়েছে, শরীর অসাড়, নড়ার শক্তি নেই। অনেক কষ্টে চোখে মেলে দেখতে পেলো টিনের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে আলোর রেখা নেমে এসেছে। হাত দিয়ে ছুঁতে চাইলো। মনে পড়ে গেলো তাদের ঘরে এমন অসংখ্য ছিদ্র যা দিয়ে আলোর রেখাগুলো ঘরের ভেতরে তীরের ফলার মত ছুটে আসে। মাকে ডাকতে চাইলো মা… ও মা… শব্দ বের হলো না। তীব্র ব্যাথায় কুঁকড়ে গেলো। ভীষণ অসহায় লাগছিলো নিজেকে। মা ভাই আর বাবার কথা মনে পড়ছিল বারবার। বাবার কাঁধে চড়ে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বাজারে যাবার কথা মনে পরছিলো। বাবা নিতান্তই দিনমজুর কিন্তু যখনই বাজারে নিয়ে যেতো মেয়েকে কিছু না কিছু কিনে দিতোই। বাবার দুলালী ছিলো এ মেয়ে। কত আদরে বড় হয়েছে সে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো।
পরের দিন সুহাস তার কাজে বেরুলো, আজকে সাইট ভিজিট এবং পল্লীর মাসিদের (সর্দার) সাথে পরিচয়ের পালা। কারন এই পল্লীতে কাজ করতে হলে মাসিদের সাথে যোগযোগ না থাকলে কাজ করা অসম্ভব। কিছু দূর গিয়ে দেখতে পেলো পল্লীর এক কোনায় অনেক মানুষ, চিৎকার, পুলিশের বাঁশির শব্দ। কিছু দূর এগুতেই সুহাস শুনতে পেলো গত কাল পরিচিত হওয়া এই এলাকার থানার ইন্সপেক্টরের কন্ঠ। সে এগিয়ে গেলো উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে। জানতে পারলো এক মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে ভীষণ নাজুক অবস্থায়। অনেকদিন ধরে নির্যাতনের ফলে সেন্সলেস। এ্যাম্বুলেন্স এসে মেয়েকে বের করতে গেলো ঘর থেকে। দরজা পার হয়ে স্ট্রেচার এগিয়ে আসছিল আর আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছিলো ফাতেমার পায়ের আঙ্গুল, পা, চির চেনা সেই মলিন শাড়ি, হাত, অবশিষ্ট দু একটি চুড়ি আর সবশেষে ফাতেমার সেই মায়া ভরা মুখ। যা এই মুহুর্তে মলিন, আঘাতে আঘাতে জর্জরীত। এক বিন্দু চিনতে কষ্ট হয় নি সুহাসের। চিৎকার করে উঠলো সুহাস – ফাতেমা…… কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। ইন্সপেক্টর ফাহিম এসে সুহাস কে সামলালেন। সুহাস বলতে শুরু করলো সব।
আজ প্রায় ৭ দিন ফাতেমা ঢাকা মেডিকেলের নিবিড় পর্যবেক্ষন কেন্দ্রে। বাইরে অপেক্ষমাণ মা, বাবা, ভাই আর সুহাস। কাজ বুঝে নিয়ে সে ছুটি নিয়ে গত ৭ দিন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এই মেডিকেলের বারান্দায়। আস্তে আস্তে নতুন ভোর হলো, আজকের আলো অন্য দিনের চেয়ে বেশি মায়া ধরানো। অনেক বেশি সুন্দর এই সকাল। খবর এলো ফাতেমা চোখ মেলেছে ছুটে গেলো বাবা মা, কিন্তু গেলো না সুহাস। তার বিশ্বাস ফাতেমা নিজে হেঁটে তার কাছে আসবে আর সুহাস তার দিকে চেয়ে বলবে – “ফাতেমা আমাকে ভালোবাসবে?”